Friday, 23 October, 2026
Logo
বিজ্ঞাপন
যাবতীয় রড, সিমেন্ট, ইট, বালি ও কনা পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় করা হয় ।। যোগাযোগ- মেসার্স হোসেন ব্রাদার্স/ জাকের ট্রেডার্স।। সোবান মঞ্জিল, বসুর হাট রোড, সিনেমা হলের পাশে, দাগনভুইয়া, ফেনী। প্রোপ্রাইটর জাকের হোসেন আলমগীর ০১৭১১-৯৬২৯২৫।। ০১৮৭১-৯৩০০০৮ মেসার্স কে আহাম্মদ এন্ড সন্স! পরিবেশক,বি এম, ডেল্টা ও ইউনি এল পি গ্যাস! যোগাযোগ- বসুরহাট রোড, সিনেমা হলের সামনে, দাগনভুইয়া, ফেনী- ০১৭১১-৩০৪৮৭৩, ০১৮৩৯-৩৯৭১৩০! দাগনভুইয়া ফিজিওথেরাপী সেন্টার, একটি আধুনিক বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিস ও মুখ বাঁকা চিকিৎসা কেন্দ্র। ঠিকানা- সোবহান মঞ্জিল, বসুর হাট রোড। (সাবেক ঝর্না সিনেমা হলের পাশে)। দাগনভুইয়া, ফেনী। 01818-019684, 01721-910110 সর্বাধুনিক মেশিনে রোগ নির্নন ও বিশেষজ্ঞ ডক্টর চেম্বার।। ফেনী ল্যাব সিটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার।। এস এস কে রোড়, ফেনী।। 01711375108/ 01815507975

ছোটগল্প- শাটলের বাঁশি,গগনশিরীষের ছায়া

ওয়ালী উল্যাহ

প্রকাশিত: / বার পড়া হয়েছে


ছবি - সংগৃহীত

চাটগাঁর পাহাড়-ঘেরা ক্যাম্পাসে যখন প্রথম পা রেখেছিল, ১৭ বছরের আলী তখন এক দূরন্ত, বাঁধনহারা তরুণ। সুন্দরী তরুণীর স্নিগ্ধতা তাকে ততটা টানত না, যতটা টানত শাটল ট্রেনের হুইসেল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সেন্ট্রাল লাইব্রেরির বইয়ের গন্ধ আর নীল আকাশের বুকে ডানা মেলা তার নিজস্ব কিছু স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস আর অমিত অভিলাষ।

আলী ভালোবাসত ফুল, ভালোবাসত গল্প, গান আর কবিতা। প্রতিদিন সকালে কলা অনুষদের করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ঝরে পড়া কৃষ্ণচূড়া মাড়িয়ে সে যেত সেমিনারে। চবির দিনগুলো ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বসন্ত। কখনো সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সিঁড়িতে বসে বন্ধুদের সাথে চায়ের কাপে ঝড় তোলা, কখনো আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল স্টেশনে একা বসে বসে ট্রেনের লাইনের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনা। তার স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল দুটি জিনিস—বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্ত বড় কোনো অধ্যাপক বা অফিসার হওয়া, আর দিনশেষে তার হৃদয়ের রানী, তার প্রেয়সী কে নিয়ে একটা ছোট্ট ভালোবাসার ঘর বাঁধা।

কিন্তু ভাগ্য যার সহায় থাকে না, তার জন্য সমস্ত আকাশটাই যেন মেঘে ঢেকে যায়। তীব্র দারিদ্র্য আর দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া তো ছিলই, তার ওপর ধেয়ে এল এক প্রলয়ংকরী রাজনৈতিক দুর্ঘটনা। ক্যাম্পাস তখন উত্তাল। দুই ছাত্র সংগঠনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে একদিন লুটিয়ে পড়ল মুছা নামের এক ছাত্র। সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতির নোংরা খেলায় ফেঁসে গেল আলী। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো মামলার আসামি হয়ে রাতের অন্ধকারে তাকে ছাড়তে হলো তার প্রিয় ক্যাম্পাস, তার স্বপ্নের চবি। উচ্চশিক্ষার রঙিন স্বপ্নটা এক নিমেষেই ধুলোয় মিশে গেল।

জীবন তাকে ছুড়ে দিল এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। অনেক কষ্টে, ক্লেশে শেষ পর্যন্ত সে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি পায়। কিন্তু মন তো পড়ে রইল সেই ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে।

 দেখতে দেখতে কেটে গেল তিন-তিনটি যুগ—দীর্ঘ ৩৬ বছর! এই তিন যুগে আলী ঘুরে বেড়িয়েছে শহর থেকে শহরে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ আর গোমতী নদীর তীর ধরে, কখনো পাহাড়ে, কখনো জঙ্গলে, এক ক্যাম্পাস থেকে অন্য ক্যাম্পাসে সে যাযাবরের মতো ঘুরেছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুল বাগানে গিয়ে সে হাত বাড়িয়ে দিত, যেন সেই ঝরে পড়া ফুলের মাঝে সে খুঁজে ফিরত চবির দিনগুলোর সেই হারিয়ে যাওয়া চেনা সৌরভ।

আজ আলী ৫০ বছরের এক প্রৌঢ় প্রাথমিক শিক্ষক। চুলে পাক ধরেছে, কপালে ক্লান্তির ভাঁজ। ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পৌঁছাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে। আর সেখানেই নিয়তি তাকে দাঁড় করিয়ে দিল এক পরম বিস্ময়ের সামনে। রাবির বর্তমান প্রো-ভিসি আর কেউ নন, স্বয়ং প্রফেসর ডক্টর আঈনুদ্দীন আল আজাদ—যিনি ছিলেন চবিতে আলীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে প্রিয়, মোস্ট সিনিয়র ভাই!

আজাদ  ভাইকে টপার স্টুডেন্ট অব চবির মতো সেই চেনা মর্যাদার আসনে দেখে আলীর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। ৫০ বছর বয়সে এসেও তার মনে হলো, চবির সেই রেল স্টেশন, সেই সেন্ট্রাল লাইব্রেরি আর প্রেয়সীর সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্নগুলো বুঝি এখনো মরে যায়নি। তার মনে হলো, জীবনের এই শেষ অপরাহ্নে এসেও যদি সে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারত! যদি আবার ফিরে পেত তার হারিয়ে যাওয়া জীবনের সেই সোনালী দিনগুলো, সেই স্বপ্নের সোনার আদুলি!

আজাদ ভাইয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারের কাচঘেরা জানালার ওপাশে তখন রাবির প্যারিস রোডের গগনশিরীষের পাতাগুলোয় গোধূলির আলো উঁকি দিচ্ছে। আলীর চোখের চশমাটা ঝাপসা হয়ে আসে। সে টেবিলের ওপাশে বসা তার একসময়ের প্রিয় আজাদ ভাইয়ের দিকে তাকায়, যিনি এখন সাফল্যের শিখরে। আলীর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার, রোমান্টিকতা আর তীব্র বিরহের সুর একসঙ্গে বেজে ওঠে। প্রেয়সী হয়তো আজ অন্য কোথাও অন্য কারো ঘরণী, তার নিজের জীবনটাও এক অসমাপ্ত উপন্যাসের পাতা। তবু এই পঞ্চাশ বছর বয়সে এসেও কেন জানি মনটা মানতে চায় না। আজাদ ভাই যখন পরম মমতায় তার কাঁধে হাত রাখলেন, আলীর শুকনো ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। সে বলতে চাইল, "ভাই, আমি কি আবার শুরু করতে পারি না? আমি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো।"

কিন্তু কথা ফুটল না। এক বুক আশা আর এক আকাশ হতাশার দোলাচলে দাঁড়িয়ে, চোখের কোণে জমে থাকা এক ফোঁটা তপ্ত জল যেন চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল; এক অদ্ভুত অতৃপ্তি আর আকুলতায় আলীর চবির সেই ফেলে আসা দিনগুলোর অসমাপ্ত গল্পটা রাবির ধূসর সন্ধ্যায় এক অন্তহীন অপেক্ষার চাদরে ঢাকা পড়ে রইল...।

Share

আরো খবর


সর্বাধিক পঠিত